ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে 'বিসিএস ডিজিটাল এক্সপো ২০০৯'-এ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠক। এতে সরকার ও দেশের নীতি নির্ধারকরা অংশগ্রহণ করছেন। এসসবের মধ্যে ‘ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা: জনগণের দ্বারপ্রান্তে নাগরিক সেবা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকটি আজ ২৭ মার্চ সকালে অনুষ্ঠিত হয় ।
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকগুলোতে ইউএনডিপি বাংলাদেশ কৌশলগত সহযোগী হিসেবে সহায়তা প্রদান করছে।অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠক-এর প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জনাব এইচ টি ইমাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের সচিব জনাব মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ এবং সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিব জনাব ইকবাল মাহমুদ
।বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের মিডিয়া বাজারে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল বৈঠকে মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি জনাব মোস্তাফা জব্বার। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক ছিলেন ইউএনডিপি বাংলাদেশর কান্ট্রি ডিরেক্টর জনাব কে এ এম মোর্শেদ। প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন সংসদ সদস্য ড. আকরাম চৌধুরী, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক জনাব মাহফুজুর রহমান, নারী নেত্রী মিসেস শিরিন আখতার, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সাবেক সভাপতি জনাব মোঃ সবুর খান ও জনাব মোঃ ফয়েজউল্যাহ্ খান, সাবেক মহাসচিব জনাব আলী আশফাক, ডাটাসফট সিস্টেমস লি:-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মাহবুব জামান, ইউএডিপি’র নন্দিতা দত্ত, ড. মতিউর রহমান, ড. আব্দুস সাত্তার প্রমুখ।
গোলটেবিল বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে 'বিসিএস ডিজিটাল এক্সপো ২০০৯'-এর সেমিনার উপ-কমিটির সদস্য সচিব জনাব টি আই এম নূরুল কবির সম্মানিত অতিথিদের জানান, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বিসিএস আয়োজিত ডিজিটাল এক্সপোতে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সকালের এই সেমিনারটি ছাড়াও আজ বিকাল তিনটায় অনুষ্ঠিত হবে ‘শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তি: ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিত্তি’ এবং আগামীকাল সকাল ১০:৩০ মি:-এ ‘জনগণের সংযুক্তি: ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি অবহিত করেন। তিনি আরো জানান, গোলটেবিল বৈঠকগুলোতে গোটা আলোচনার বিষয়বস্তু রেকর্ড করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বেড়িয়ে আসা বিষয়গুলো সরকারের নিকট সুপারিশ করা হবে এবং পরবর্তীতে এসবের অনুসরণ করে ধারাবাহিক অনুষ্ঠান (ফলোআপ প্রোগ্রাম) আয়োজন করা হবে।
গোল বৈঠকের মডারেটর জনাব মোস্তাফা জব্বার বিসিএস ডিজিটাল এক্সপো আয়োজনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করার পাশাপাশি বলেন, সরকারের ঘোষিত ‘রূপকল্প ২০২১’-এর অন্যতম কর্মসূচি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এখনও ঢাকার বাইরের সরকারী উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ তথ্যপ্রযুক্তিকে নিজেদের সকল কাজে ব্যবহার করছেন না। এছাড়া দেশের তৃণমূলে যেকোন তথ্য পেতে হলে তাদের দ্বারস্থ হয়েও কোন ফলাফল পাওয়া যায় না। এরপর তিনি আজকের গোলটেবিল বৈঠকের মুখ্য আলোচক ইউএনডিপি বাংলাদেশের এসিস্ট্যান্ট কান্ট্রি ডিরেক্টর জনাব কে এ এম মোর্শেদকে তাঁর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের আহ্বান জানান।
মুখ্য উপস্থাপক জনাব কে এ এম মোর্শেদ তাঁর মূল প্রবন্ধে বলেন যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বপ্ন পুরণে প্রথমেই সব ধরনের সেবা জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে অবিলম্বে ই-গভর্ণনেন্স চালু করতে হবে। এজন্য সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। এই সুবিধাগুলো জনগণের যেভাবে কাজে লাগে সেভাবেই দিতে হবে। যাতে তারা সুবিধাগুলো উপভোগ করতে পারে তার যথাযথ ব্যবস্থা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, এই সুবিধাগুলো শুধুমাত্র যে ইন্টারনেটভিত্তিক হতে হবে তা নয়, এগুলো বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার আলোকেই দিতে হবে। যেমন- যেখানে মোবাইল ফোন আছে সেখানে মোবাইল ফোনের মাধ্যেমে এগুলো দেওয়াই উত্তম।
তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের মূল ওয়েব পোর্টাল তৈরী হচ্ছে যাতে জনগণের জন্য সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করার ব্যবস্থা থাকবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, এই সুযোগ-সুবিধাগুলো উপভোগের অন্যতম মূল অন্তরায় ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের অভাব। এর সূচনা হিসাবে ইতিমধ্যে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ, ওয়াসা ও গ্যাস বিল দেওয়ার সুবিধাদি সরকার অনুমোদন করেছে। আশা করা যায় খুব শীগগিরই অন্যান্য ক্ষেত্রেও এ ধরনের সুবিধা অবিলম্বে প্রচলিত হবে।
মূল প্রবন্ধের উপস্থাপনায় জনাব মোর্শেদ আরও বলেন, তৃণমূলে ব্যবহার বাড়াতে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সুফল পৌঁছে দিতে নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে উৎসাহ দিতে হবে, বিদ্যমান অবকাঠামোগত সুবিধাগুলো ব্যবহার করতে হবে, জেলা প্রশাসকদের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা দিতে হবে এবং বার্ষিক গোপন প্রতিবেদনে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য পৃথক প্রণোদন দিতে হবে। কে এ এম মোর্শেদের মূল প্রবন্ধ এতদ্সঙ্গে যুক্ত করা হল।
গোলটেবিল বৈঠকের প্রধান অতিথি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জনাব এইচ টি ইমাম আলোচনায় অংশগ্রহণ করে বলেন, এ পর্যন্ত যেসব উদ্যোগের কথা জানা গেছে, তা সবই হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। বিচ্ছিন্ন কোন উদ্যোগ বড় কোন পরিবর্তন আনতে পারে না। এ জন্য এসব উদ্যোগের সমন্বয় সাধন করা দরকার। প্রয়োজন পুরণো ও নতুন প্রজন্ম, আইটি বিশেষজ্ঞ, সরকার সবাই মিলে সমন্বিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা ও সমন্বিতভাবে তা পরিচালনা করা। তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করতে হলে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোল’ এমন একটি আন্দোলন দরকার। যে আন্দোলনে সব মানুষের, সব ক্ষেত্রের, সব শ্রেণীর, সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকবে। যদি এটা করা যায়, সরকার সকলের পাশেই আছে, অবশ্যই আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন করতে পারব বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংসদ সদস্য ড. আকরাম চৌধুরী আলোচনায় অংশগ্রহণ করে বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ কোন সমস্যা সংসদে উপস্থাপন করতে গেলে জনপ্রতিনিধি বিধি-৭১-তে তা উপস্থাপন করতে হয়। এতে মাত্র ৩টি বিষয় উপস্থাপন করা যায়, ১৫ জন কথা বলতে পারেন মাত্র দু’ মিনিট করে। ফলে সে সব নোটিশ নোটিশ হিসেবেই থেকে যায়। যদি সংসদ ও সংসদ সদস্যদের সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর এমন ডিজিটাল সম্পর্ক স্থাপন করা যায়, যাতে ওই নোটিশের সবকিছু তাকে আগাম জানানো যেতে পারে। এটি করা গেলে জনসমস্যাগুলো বস্তুনিষ্টভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এজন্য একটি সমন্বিত প্রয়াস ও ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তিনি এছাড়াও টেলিকনফারেন্স, টেলিমেডিসিন, প্রতিগ্রামে তথ্য কেন্দ্র তৈরি এবং সর্বপরি ই-গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা প্রচলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ক্যাবিনেট ডিভিশন সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব জনাব আব্দুল আজিজ বলেন, যারা ই-গভনেন্স চালুর আন্দোলন করছে, যারা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন তাদের উদ্যোগ ও আন্তরিকতার কোন ঘাটতি নেই। কিন্তু যাদের জন্য এ উদ্যোগ তারা এ বিষয়ে কতটুকু সচেতন তা জানা দরকার। এদেরকেও তেমনিই সচেতন ও তৎপর করে তোলা জরুরি। এ দু’টি ক্ষেত্রে জোর প্রতিষ্ঠা হলে যারা এটি বাস্তবায়ন করবে, অর্থাৎ সরকারের জন্য এটি আরও সহজতর হবে। আগামী প্রজন্মের মধ্যে এ বিষয়ে চিন্তাধারা আনতে হবে। এজন্য শিক্ষাক্রমেও এ বিষয়ে কার্যকর পাঠ্যসূচি ও ব্যবস্থাপনা চাই। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদে বার্ষিক গোপন প্রতিবেদনে আইটি জ্ঞান ও ব্যবহারকে যোগ করার উদ্যোগ নেয়া হবে বলে তিনি অবহিত করেন।
নারী নেত্রী শিরিন আখতার আলোচনায় অংশগ্রহণ করে বলেন, অটোমেশন পরবর্তী সংকটগুলো কীভাবে মোকাবেলা করা যায় সে বিষয়ে আগাম পদক্ষেপ নিতে হবে। আদম ব্যবসা, বিভিন্ন দালাল ও ফড়িয়া এবং এ ধরনের অন্যান্য শ্রেণীর লোকজনের খপ্পর থেকে বাঁচতে ইন্টারনেট ভিত্তিক তথ্য কেন্দ্র থাকতে হবে। তিনি অবিলম্বে ই-কমার্স ও ই-ব্যাংকিং চালুর আহ্বান জানান। নারীরা যেন ইন্টারনেটের মাধ্যমে থানা, আদালতে যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে পারে তার ব্যবস্থা করার উপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।
বিসিএস-এর সাবেক সভাপতি জনাব মোঃ সবুর খান বলেন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে অবশ্যই সরকারি চাকুরিতে আইটি ক্যাডার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিসিএস-এর অপর সাবেক সভাপতি জনাব মোঃ ফয়েজউল্যাহ্ খান প্রত্যেক গ্রামগঞ্জে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাইবার কিয়স্ক স্থাপনের আহবান জানান। সংগঠনের সাবেক মহাসচিব জনাব মোঃ আলী আশফাক অবিলম্বে জবাবদিহিতামূলক ই-গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা চালুর অনুরোধ জানান। ডাটা সফট-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মাহবুব জামান সরকারি প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে চট্রগ্রাম কাস্টমস হাউস অটোমেশনে বাধাগুলোর কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন অটোমেশন করলে কাজের গতি বাড়বে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
technorati
del.icio.us
digg
yahoo
google
reddit
blinklists
blogmarks
facebook
twitter
কোন মন্তব্য নেই: